Tag Archives: লালন পদাবলি

এখনো সাধ আছে তোমার আ’ল ঠেল বলে

এখনো সাধ আছে তোমার আ’ল ঠেল বলে ।
চুল পেকে হয়েছে হুড়ো চামড়া বুড়ো ঝুলমুলে ।।

হেঁটে যেতে হাঁটু নড়বড়ায়
তবু যেতে সাধ মন বার-পাড়ায়
চেংড়ার সুমার বুদ্ধি তোমার
ভুজ কুয়ারা জানালে ।।

গায়ে ভস্ম মেখে লোকেরে দেখাও
মনে মনে মন কলাটি কান্ড
তোমার নাই সবুরি, চাম কুঠুরি
ছাড়বি রে তুই কোনকালে ।।

মন আমার পাগলা বুড়া পির
লালন কয় মোর বুদ্ধি রয় না স্থির
মন কি মুনাই যদি হাতে পাই
তবে কি ভুরো সিজাই অকালে ।।


এখন কেনে কাঁদছ রাধে নির্জনে

এখন কেনে কাঁদছ রাধে নির্জনে ।
ও রাধে, সেইকালে মান করেছিলে
সেই কথা তোর নাই মনে ।।

ও রাধে কেনে কর মান
ও কুঞ্জে আসে না যে শ্যাম
জলে আগুন দিতে পারি বিন্দা আমার নাম
ও রাধে হাত ধরে প্রাণ সঁপে ছিলে কেনে ।।

চল আমরা সব সখি মিলে
ও একটি বনফুল তুলে
বিনে সুতায় মালা গেঁথে দিব শ্যাম গলে
লালন কয়, শ্যাম হয়ে বসব রাধার ডানে ।।


এক আসমানি চোর ভবের শহর লুটছে সদাই

এক আসমানি চোর ভবের শহর লুটছে সদাই ।
আসা-যাওয়া কেমন রাহা কে দেখেছ বলো আমায় ।।

শহর বেড়ে অঘাত দোরে
মাঝখানে ভাবের মন্দিরে
সেই নিগুম জায়গায়
তার পবনদ্বারে চৌকি ফেরে
এমন ঘরে চোর আসে যায় ।।

এক শহর চব্বিশ জেলা
ডাক কামান ছাড়ে দু’বেলা
বলিয়ে জয় জয়
ধন্য চোরে এ ঘর মারে
রাখে না কাহার ভয় ।।

মন বুদ্ধির অগোচর চোরা
আজ বললে কি পাবি তোরা
আমার এই কথায়
লালন বলে ভাবুক হলে
চোরের ধাক্কা লাগে তারি গায় ।।


একাকারে হুহুংকার মেরে আপনি সাঁই রাব্বানা

একাকারে হুহুংকার মেরে আপনি সাঁই রাব্বানা ।
অন্ধকার, ধন্দকার, কুওকার, নৈরেকার সব লিনা ।।

কুন্ বলে এক শব্দ করে
সেই শব্দে দূর ঝরে
ছটি গুটি হল তাতে
শোন গো তার বর্ণনা ।।

সেই ছয় গুটি হতে
ছয়টি জিনিস পয়দা তাতে
আসমান জমিন সৃজিতে
মনে তার বাসনা ।।

ছয়েতে তসবি হল
সেই তসবি জপ করিল
কোরানেতে প্রমাণ রল
লালন কয় শোন তার ঠিকানা ।।


একি অনন্ত লীলা তার দেখ এবার

একি অনন্ত লীলা তার দেখ এবার ।
আলেক পুরুষ খাকে বারি ক্ষণেক ক্ষণেক হয় নিরাকার ।।

আছে সাঁই নৈরাকারে
ছিল কুদরতের জোরে
সংসার সৃজনের তরে
ধরিলে প্রকৃতি আকার ।।

শুনি সাঁই করিম কয় তার
কার অংশে তিন আকার
কারে ভজে কারে পাব
দিশে পাই নে তার ।।

ভেবে পাই নে তার অন্বেষণ
মনে কিবা পাবি তখন
বিনয় করে বলছে লালন
ঘুচাও আমার ঘোর অন্ধকার ।।


একি আজগুবি এক ফুল

একি আজগুবি এক ফুল ।
ও তার কোথায় বৃক্ষ কোথায় আছে মূল ।।

ফুটেছে ফুল মান সরোবর
স্বর্ণগোঁফা ভ্রমরা তার
কখন মিলন হয় রে দোহার
রসিক হলে জানা যায় রে স্থূল ।।

শম্ভু বিম্বু নাই রে সে ফুলে
মধুকর কেমনে খেলে
পড় সহজ প্রেম-ইস্কুলে
জ্ঞানের উদয় হলে যাবে ভুল ।।

শনি মুকুল এরা দু’জন
সে ফুলে হইল সৃজন
সিরাজ সাঁই বলে রে লালন
ফুলের ভ্রমণ কে তা করগে উল্ ।।


একবার চাঁদবদনে বল রে সাঁই

একবার চাঁদবদনে বল রে সাঁই ।
বান্দার এক দমের ভরসা নাই ।।

কি হিন্দু কি যবনের বালা
পথের পথিক চিনে ধর এই বেলা
পিছে কাল-শমন আছে সর্বক্ষণ
কোনদিন বিপদ ঘটাবে ভাই ।।

আমার বিষয় আমার বাড়িঘর
সদাই এই রবে দিন গেল রে আমার
বিষয় বিষ খাবা সে ধন হারাবা
শেষে কাঁদলে কী আর শুনবে তাই ।।

নিকটে থাকিতে রে সে ধন
বিষয় চঞ্চলাতে খুঁজলে না এখন,
অধীন লালন কয় এ ধন কোথা রয়
আখেরে খালি হাতে সবাই যাই ।।


একবার জগন্নাথে দেখ না রে যেয়ে

একবার জগন্নাথে দেখ না রে যেয়ে
জাতকূল কেমন রাখ বাঁচায়ে ।।
চন্ডালে রাঁধিলে অন্ন ব্রাহ্মণে তাই খায় চেয়ে ।।

জোলা ছিল কুবীর দাস
তার তুড়ানি বার মাস
উঠিছে উথলিয়ে ;
সেই তুড়ানি খায় যে ধনি
সেই আসে দর্শন পেয়ে ।।

ধন্য প্রভু জগন্নাথ
চায় না রে সে জাত অজাত
ভক্তের অধীন সে ;
জাতবিচারি, দুরাচারি
যায় তারা সব দূর হয়ে ।।

জাত না গেলে পায় না হরি
কী ছার জেতের গৌরব করি
ছুঁসনে বলিয়ে ;
লালন কয় জাত হাতে পেলে
পোড়াতাম আগুন দিয়ে ।।


একদিন পারের কথা ভাবলি নারে

একদিন পারের কথা ভাবলি নারে ।
পার হব হিরের সাঁকো কেমন করে ।।

বিনে কড়ির সদাই কেনা
মুখে আল্লার নাম জপ না
তাইতে কি অলসপানা
দেখি তোরে ।।

এক দমের ভরসা নাই
কখন কি করবেন গো সাঁই
তখন কার দিবি দোহাই
কারাগারে ।।

ভাসাও অনুরাগের তরি
বসাও মুর্শিদ কান্ডারি
লালন কয় সেই সে পাড়ি
যাবে সেরে ।।


এক ফুলে চার রঙ ধরেছে

এক ফুলে চার রঙ ধরেছে ।
ও সে ভাবনগর ফুলে কি আজব শোভা করেছে ।।

মূল ছাড়া সে ফুলের লতা
ডাল ছাড়া তার আছে পাতা
এ বড় অকৈতব কথা
কে পেত্যাবে কই কার কাছে ।।

কারণ-বারির মধ্যে সে ফুল
ভেসে বেড়ায় একুল ওকুল
শ্বেতবরণ এক ভ্রমর ব্যাকুল
সেই ফুলের মধুর আসে ।।

ডুবে দেখ মন দিলদরিয়ায়
যে ফুলে নবীর জন্ম হয়
সে ফুল তো সামান্য ফুল নয়
লালন কয় যার মূল নাই দেশে ।।